Chapter 1
গ্রামের নাম ছিল শালবন। চারদিকে ঘন জঙ্গল, পুরনো কাঁচা রাস্তা আর অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা—যেন এই গ্রামটা সময়ের বাইরে কোথাও আটকে আছে। সূর্য ডুবলেই শালবন অন্য এক রূপ নিত। গ্রামের মানুষজন সন্ধ্যার আগেই দরজা-জানালা বন্ধ করে দিত, আর কেউই অকারণে বাইরে বের হতো না।
এই গ্রামেই একদিন এল মেয়েটি—তার নাম ইরা।
ইরা শহর থেকে এসেছে, তার বাবার পুরনো বাড়িতে থাকতে। বাড়িটা অনেকদিন ফাঁকা ছিল। গ্রামের মানুষজন ফিসফিস করে বলত, ওই বাড়িতে কেউ বেশিদিন থাকতে পারে না। কিন্তু ইরা এসব কথা বিশ্বাস করত না। তার চোখে ছিল কৌতূহল, আর মনের ভেতর এক অদ্ভুত জেদ |
প্রথম দিন থেকেই সে কিছু অস্বাভাবিক জিনিস টের পেতে শুরু করল।
রাত নামার পর বাড়ির ভেতর থেকে হালকা পায়ের শব্দ আসত—টুপ… টুপ… যেন কেউ ধীরে ধীরে হাঁটছে। ইরা
ভাবল, হয়তো ইঁদুর বা বিড়াল। কিন্তু শব্দটা ছিল খুব নিয়মিত… আর খুব মানবীয়।
এক রাতে, ঘুম ভেঙে গেল তার।
কারণ, কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছিল—
"ইরা…"
কণ্ঠস্বরটা খুব ধীর, খুব ঠান্ডা।
সে উঠে বসে চারদিকে তাকাল। ঘর অন্ধকার, শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে। আবার সেই ডাক—
"ইরা… দরজা খোলো…"
তার বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল। হাত বাড়িয়ে দরজার কপাটে স্পর্শ করতেই হঠাৎ মনে হলো—এই কণ্ঠস্বরটা বাইরের নয়… ভেতরের।
সে তাড়াতাড়ি দরজা থেকে সরে এল।
পরদিন সকালে গ্রামের এক বৃদ্ধা, কমলা বৌদি, তাকে সাবধান করল—
"রাতে কেউ ডাকলে দরজা খুলবি না মা। যা-ই হোক, কখনো না।"
ইরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন?"
বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "ওই বাড়িতে আগে এক মেয়ে থাকত… তার নামও ছিল ইরা।"
ইরার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
"সে এক রাতে হারিয়ে যায়। কেউ তাকে আর খুঁজে পায়নি। শুধু… মাঝে মাঝে তার ডাক শোনা যায়।"
সেই রাতটা ছিল আরও ভয়ংকর।
মধ্যরাতে ইরা আবার সেই শব্দ শুনল—পায়ের শব্দ, এবার যেন আরও কাছে। তার ঘরের বাইরে। তারপর দরজায় হালকা টোকা—টক… টক…
"ইরা… আমি এসেছি…"
এইবার কণ্ঠস্বরটা একেবারে পরিষ্কার।
কিন্তু ভয়ের মধ্যেও ইরার মনে হলো—এই কণ্ঠস্বরটা যেন তার নিজের মতো!
মতো!
সে ধীরে ধীরে আয়নার দিকে তাকাল।
আর তখনই তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
আয়নায় তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটা মেয়ে।
একই মুখ, একই চোখ… শুধু তার চোখদুটো একেবারে ফাঁকা, অন্ধকার।
ইরা ঘুরে দাঁড়াল।
কিন্তু ঘরে কেউ নেই।
আবার দরজায় টোকা—এবার জোরে।
"দরজা খোলো… আমাকে ভেতরে আসতে দাও…"
ইরার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। তার মনে হতে লাগল, যেন কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তার হাত নিজে থেকেই দরজার দিকে এগোতে লাগল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল কমলা বৌদির কথা।
সে জোর করে নিজেকে থামাল।
"না… আমি দরজা খুলব না," সে ফিসফিস করে বলল।
এক মুহূর্তে সব শব্দ থেমে গেল।
নিস্তব্ধতা।
তারপর… দরজার ওপাশ থেকে এক ভয়ংকর হাসি ভেসে এল—
"তুই ভাবছিস বাঁচবি?"
পরদিন সকালে ইরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত
নিল।
কিন্তু যাওয়ার আগে, সে একটা জিনিস খেয়াল করল।
বাড়ির দেয়ালে পুরনো একটা ছবি টাঙানো ছিল। ছবিতে একটা মেয়ে—তার মুখটা অদ্ভুতভাবে চেনা লাগছিল।
ছবির নিচে লেখা—
"ইরা (১৯৯৮–২০১৬)"
ইরা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, ছবির মেয়েটা একটু একটু করে হাসছে।
সেদিন বিকেলে ইরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেল।
সবকিছু যেন শেষ হয়ে গেল…
কিন্তু কয়েক মাস পরে, নতুন এক পরিবার ওই বাড়িতে
থাকতে এল।
তাদের ছোট মেয়েটা এক রাতে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—
"মা… একটা আপু আমাকে ডাকছে…"
"কি বলছে?" তার মা জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটা ফিসফিস করে বলল—
"সে বলছে… 'আমি ইরা… দরজা খোলো…'"
আর সেই মুহূর্তে, ঘরের আয়নায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠল আরেকটা মুখ।
একটা মেয়ে… যে কখনোই সেই বাড়ি ছাড়েনি।
