WebNovels

হৃদয়মিলন

Firoj_Khan_2013
7
chs / week
The average realized release rate over the past 30 days is 7 chs / week.
--
NOT RATINGS
208
Views
Table of contents
VIEW MORE

Chapter 1 - Unnamed

হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি আমি

‎আর সামনের টিভির স্কিনে লাইভ দেখাচ্ছে কীভাবে আমার হাসবেন্ড একটা মেয়ে কে কোলে করে নিজের গার্লফেন্ডের পরিচয়ে নিজের গাড়ি তে বসাচ্ছে। আমি শুধু স্তব্ধ হয়ে দেখছি আর ভাবছি কিছুদিন আগের কথা,

‎ঐদিন সকালেই আমার মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমি শুনে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে চলে আসি মায়ের কাছে। আমার মা একা গ্রামে থাকে। বাবা আরও বছর এক আগে মারা গিয়েছে। আমি মাকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছি আামার সাথে শহরে যেতে কিন্তু মা যায়নি। পুরোটা রাস্তা কীভাবে কেটেছে আমার শুধুমাত্র আমি জানি। কিন্তু একবারের জন্যও আমি ভাবিনি আমার মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।

‎বিশ্বাস তো তখন হলো যখন আমি নিজের চোখে দেখেছি তাকে সাদা কাফনে। এক মুহূর্তের জন্য আমার সারা পৃথিবী ঝাপসা হয়ে এসেছে। মা ছাড়া আমার এই পৃথিবীতে আপন আর কেউ নেই। কাঁপা কাঁপা হাতে মাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করার আগেই আমি মাটিতে লুটিয়ে পরে যাই। মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দই বের হয় "মা"।

‎আমার জ্ঞান ফিরে কিছুক্ষণ পরে, মনে হচ্ছিল আমি সব সপ্ন দেখেছি। কিন্তু না চারপাশের মানুষের শোরগোলে মুহূর্তে আমি বাস্তবে ফিরে আসি। পাশের বাড়ির চাচি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে জানায় তারা ইতিমধ্যে মায়ের গোসল সেরে পেলেছে। আমি যেন শেষ বারের মতো তাকে দেখে আসি। আমি কালবিলম্ব না করে দৌড়ে যাই মায়ের কাছে। মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কান্না করছি আর বলছি,

‎" কীভাবে তুমি পারলে এই নিষ্টুর পৃথিবীতে আমাকে একা ফেলে যেতে? কেউ না জানুক তুমি তো জানতে আমার আর কেউ নেই। তারপর ও কীভাবে চলে গেলে? তুমি একবারও আমার কথা কেন ভাবলে না। কেন মা? "

‎আমার আহাজারিতে হয়তো কারও চোখে জল, আবার কার ও চোখে একটু দয়া। চরদিক চাপিয়ে আমার কানে আর কিছুই আসে নি। তার আগেই দ্বিতীয় বারের মতো জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাই।

‎দ্বিতীয় বারের মতো আমি চোখ খোলে দেখি আমি বিছনাতে। কিছুক্ষণ আগে ও যেখানে এত মানুষের আনাগোনা ছিল তা এখন নিস্তব্ধতায় চেয়ে গিয়েছে। বুঝতে পারলাম তারা মাকে নিয়ে চলে গেছে। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। পাশের টেবিলের উপরে মায়ের ছবিটাকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ি। আমার কান্না শুনে বাহির থেকে চাচি এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তিনি বলেন মা নাকি তিনদিন ধরে জ্বরে ভোগছেন। আমাকে জানাতে নিষেধ করে। আজ সকালেই ওনি এসে দেখে মা আর নেই। কেউ জানতেই পারল না মা কখন চলে গেছে।

‎কিছুক্ষন পর তিনি বলেন, আমার হাসবেন্ড কেন আসেনি? তখন আমার ওনার কথা মনে পড়ে। মায়ের চিন্তায় সব মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। আমি মোবাইল হাতে নিয়ে অনেক্ষণ কল করি। কিন্তু ঐ পাশ থেকে বার বার একটা কথা ই আসে, "এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব না "

‎সারাটা রাত কাটে আমার কান্নায়। সকালে একবার ফোন রিসিভ হয়। আমি কিছু বলার আগেই ঐখানে পাশ থেকে আমার হাসবেন্ডের ম্যানেজার কর্কশ ভাষায় বলে ওঠে,

‎" ম্যাম প্লিজ, আপনার কি নূন্যতম জ্ঞান টুকুও নেই। এতবার কল দেওয়ার পর যখন দেখলেন কল ধরছে না তার মানে ওনি ব্যাস্ত। আর স্যার বলে দিয়েছেন আপনার ফালতু কথা শুনার সময় স্যারের কাছে নেই "

‎ব্যাস কথা শেষ টুট টুট শব্দ করে কল কেটে গেল। আমি কানে ফোন লাগিয়ে এখনো দাড়িয়ে আছি। শত চেষ্টার পরে ও চোখের জল বাধ মানলো না।

‎এভাবেই কেটে যায় সাতদিন। ঐদিনের পর আমি কয়েক বার কল দিয়েছি কিন্তু প্রতিবার ই বন্ধ বলেছে, বুঝলাম আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। সকালে ওঠে তৈরি হয়ে নিলাম বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য কারণ এইখানে থাকলেই আমার মায়ের কথা মনে হবে বার বার। আর আমার আত্মীয় স্বজন ও কেউ নেই মা অনাথ ছিল।

‎বিকাল তিনটার দিকে আমি ঢাকায় আসি। কালরাত থেকে না খাওয়া, আবার সকাল থেকে জার্নি তাই বেশিক্ষণ দাড়াতে পারলাম না। সেখানেই পরে যাই।

‎চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করলাম সাদা ধবধবে হসপিটালের বেডে। আমি ওঠে বসতেই একজন নার্স এগিয়ে এসে জানালেন একটা মেয়ে আমাকে নিয়ে এসে ভর্তি করিয়ে দিয়ে গেছে। শরীর দুর্বল আর না খাওয়াতে এমনটা হয়েছে।

‎দুটো স্যালাইন শেষ করে হাটা দিলাম হসপিটালের করিডোরের দিকে। আর সেখানেই দেখলাম হসপিটালের অপেক্ষাকৃত লোকদের বিনোদনের জন্য রাখা সেই টিবিতে অনাকাঙ্খিত দৃশ্যটি। পা যেন সেখানেই জমে গিয়েছিল। আমি শত চেষ্টা করে ও নড়তে পারছিলাম না।

‎কিছুক্ষন পর বাহির থেকে অনেক শোরগোলের আওয়াজ আমার কানে আসল। ফিরে দেখি আমার হাসবেন্ড ঐ মেয়েটিকে কোলে করে দৌড়ে নিয়ে আসছে আর ডাক্তারদের ডাকাডাকি করছে অস্থির ভাবে। একমুহূর্তে ডাক্তার নার্স সবাই ব্যস্ত হয়ে পরল। কারণ তারা ছিল ফেমাস সেলিব্রিটি। সেই ভিড়ের মাঝে আমি তার সামনেই ছিলাম কিন্তু সে আমার দিকে ফিরে ও তাকাড়নি। আর কিছু দেখার ইচ্ছে হলো না। ব্যথিত মন নিয়ে চলে আসি ফ্ল্যাটে।

‎ফ্ল্যাটে এসে একজন সার্ভেন্ট কে ডেকে জিজ্ঞেস করি,

‎"তোমাদের স্যার আমার কথা জিজ্ঞেস করেছে? "

‎সে বিষন্ন মুখে বলল্,

‎"না ম্যাম, স্যার তো গত সাতদিন ধরে বাসায় আসেন নি "

‎ভ্রু কুচকে তাকালাম ওর দিকে, ও তড়িঘড়ি করে বলতে শুরু করল,

‎" স্যার কল করে জানিয়েছেন তিনি শুটিংয়ের জন্য সাতদিন ঢাকার বাহিরে থাকবেন। আর, "

‎হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিলাম কারণ শোনার ইচ্ছা আমার আর নাই। সে চলে গেল নিজ কাজে। আমি বসে আছি সোফায় আজ এর একটা বিহিত অবশ্যই করা প্রয়োজন।

‎রাত ১২ টার দিকে সে বাসায় ফিরে। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতটা ক্লান্ত। আমার দিকে না তাকিয়ে ও নিজের রুমের দিকে যেতে চাইল তার আগেই আমি পিছন থেকে ডাকি,

‎"দাঁড়ান"

‎সে পিছন ফিরে এগিয়ে এসে বলল,

‎"কি, দেখ আমি ভীষণ ক্লান্ত, খাওয়া দাওয়া করে এসেছি খাব না। ডোন্ট ডিস্টার্ব মি"

‎তাচ্চিল্য ভরা হাসি দিয়ে তাকে বললাম,

‎" হ্যা ক্লান্ত তো হবেনই। সারাদিন গার্লফ্রেন্ড কে নিয়ে ঘুরে, তাকে কোলে করে হসপিটালে নিলে মানুষ কী আর ভালো থাকবে?"

‎সে একটু এগিয়ে এসে বলল,

‎"মানে?"

‎" মানে টাতো আমি টিভিতেই দেখে নিয়েচি,

‎মিস্টার রানভীর জাওয়ান "

‎রানভীরের কথাটা পছন্দ হলো না। সে দাঁত খিঁচিয়ে বলে ওঠে,

‎" তোমাকে কতবার বলেছি এসব ফালতু কথায় কান না দিতে সানা"

‎"আমি নিজ চোখে দেখেছি "

‎"তোমার কী কোন কাজ নাই আমার পিছনে লাগা ছাড়া"

‎"আপনি গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরতে পারবেন আর আমি বললেই দোষ "

‎রানভীর চিৎকার করে ওঠল," সানা"

‎সানা তার দ্বিগুণ তেজ নিয়ে চড়া গলায় বলল্,

‎"কী সানা কী, আপনার কাছে এই সম্পর্কের কোন মূল্যই নেই, থাকলে অন্তত ঘরে বউ রেখে ঔ মেয়ের সাথে নষ্টামি করতে গেলেন....

‎আর কিছু বলা হয়ে ওঠল না তার আগেই তার গালে রানভীরের পাঁচ আঙ্গুল, ঠাসসসসসস

‎একটা থাপ্পড়, সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সানা কল্পনাও করতে পারে নি এমন কিছু হবে। তারপরে শোনা গেল রানভীরের চিৎকার, ইতিমধ্যে তার চোখ লাল হয়ে গিয়েছে, রাগে রি রি করে বলল,

‎"হ্যা আমি নষ্টামি করতে গিয়েছি হয়েছে। আর আমি বিয়ের সময়ই বলে দিয়েছি না আমি তোমাকে স্ত্রী হিসেবে মানব,আর না স্বকৃীতি দিব।আর হ্যা আমার কাছে এই সম্পর্কের কোন মূল্য নেই। কারণ তোমার মত একটা মেয়ে আমার পাশে যায় না। আর কোনদিন তুমি আমাকে এইরকম প্রশ্ন করবে না। গট ইট "

‎কথা শেষ ধুপধাপ পা ফেলে নিজের রুমে গিয়ে সজোরে দরজা লাগিয়ে দিল।অথচ সে বুঝতেই পারল না কতবড় ভুল করেছে

‎সানাও ধীরে ধীরে নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিলে। বাথরুমে গিয়ে সাওয়ার ছেড়ে তার নিচে বসে পরল। কান্নার সাথে তার দুঃখ কষ্ট সব বেড়িয়ে এলো। ঘন্টা খানিক পর নিজের জামা পাল্টে বেলকনিতে গেল। চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠল,

‎" লাইফের সবচেয়ে বড় ভুল টা মনে হয় আপনি আজকে করেছেন। আপনি আমাকে চিনতেই পারেননি। জোর করে বিয়ে তো আমার ও দেওয়া হয়েছিল, বাট এই একবছর আমি অনেক চেষ্টা করেছি মায়ের কথা রাখার, কিন্তু এখন যখন মা নেই তাহলে কথা রাখার কি দরকার"

‎শক্ত হয়ে আসল সানার ছোয়াল, আবারও বলে ওঠল,

‎"মিস্টার রানভীর জাওয়ান, অবহেলার খেলাটা আপনি শুরু করেছেন। আর তার সমাপ্তি হবে আমার বিজয়ের মাধ্যমে। যেদিন আমি এই খেলায় জিতে যাব, ঐদিন থেকে আমার অস্তিত্ব চিরতরে আপনার জীবন থেকে মুচে যাবে "

‎ধীরে ধীরে তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হলো। আবার ও হিসহিসিয়ে বলল্

‎So, let's play the game and I swear

‎I will ignore you like that,

‎You never existence in front of me or in my life."

#পর্বসংখ্যা১

#হ্রদয়ামিলন

#Shavakhan

--------------------

#পর্বসংখ্যা২

‎ #হ্রদয়ামিলন

‎ Shavakhan

‎আকাশের চাঁদ টা হঠাৎ মেঘের আড়ালে চলে গেল। নিস্তব্ধ নিশুতি রাত, মূহুর্তে চারিদিকে অন্ধকার চেয়ে গিয়েছে। এই অন্ধকারে একা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে সানা।তার মনটা ও পরিবেশের সাথে পাল্লা দিয়ে অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। না এখানে আর থাকা যাবে না। কাল থেকে তার জীবন পাল্টাতে চলছে, তার জন্য একটা লম্বা ঘুম দরকার। সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।

‎সানা খান, বাবা মোশতাক খান যিনি একজন গ্রামের হাই স্কুলের সাধারণ শিক্ষক আর মা আয়েশা খাতুুন।এক বছর আগেই ভদ্রলোক গত হয়েছেন, তারপরেই সানার জীবন পাল্টে যায়। এক অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের মাঝে বাধা পরে সে।প্রথমে মানতে না চাইলে ও পরে এটাকে ভাগ্য আর মায়ের জোড়াজুড়িতে মেনে নেয়,নিজেকে ও পাল্টায়। কারণ এসব সম্পর্কের ধার সে কোন দিন ও ধরত না।

‎অন্যদিকে, রানভীর জাওয়ান, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বিখ্যাত নামি দামি অভিনেতা ও গায়ক। যার প্রতিটা ফিল্ম হয় সুপারহিট আর কনসার্ট এ থাকে উপচে পরা ভীর।ফ্যান ফলোয়িং তো অভাবনীয় তাকে সবাই এক নামে চিনে RJ নামে। পিতা ইকবাল জাওয়ান জেবি কোম্পানির ফাউন্ডার কিন্তু আট নয় মাস আগে ভদ্রলোক পরলোক গমন করেন। ইকবাল জাওয়ান এর অনুপস্থিতিতে ওনার ছোটভাই ফিরোজ জাওয়ান কোম্পানির সবকিছুর দেখা শুনা করেন। যদিও কোম্পানি আর জের নামে। আর কোম্পানির হেড ডিজাইনার হলো নাতাসা জাওয়ান ওনার একমাত্র মেয়ে, আর জের চাচাতো বোন। ইকবাল জাওয়ানের স্ত্রী মিসেস সোফিয়া জাওয়ান যার নিজের প্রডাকশন হাউস রয়েছে যেটি বর্তমানে নাম্বার ওয়ানে আছে, 'জেবি প্রডাকশন হাউস'।আর জের একমাত্র ছোট বোন রিয়ানা জাওয়ান তার মায়ের প্রডাকশন হাউসের এলপি মানে লাইন প্রডিউসার। মিসেস সোফিয়া,নাতাসা, ফিরোজ, রিয়ানা জাওয়ান ম্যানশনে থাকেন, সানা আর আর জে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে।

‎সকালের হালকা মিষ্টি রোদটা বেলকনি উপচে জানালা দিয়ে সানার মুখ ছুয়ে দেয়। সানা আরমোড়ো ভেঙে হামি তুলতে তুলতে উঠে বসে। এভাবেই বসে থাকে দুুই কি তিন মিনিট। এটা তার অবাঞ্ছিত অভ্যাস। ঘুম থেকে উঠে চারদিক বুঝতে ওর এই সময়টুকু লাগে। একপলক ঘরির দিকে নজর বুলাতেই বুঝল আটটার উপরে বাজে। অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে আজ। সানা সময় কে উপেক্ষা করে নিজের রুমে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখল, পুরো রুমের দেওয়াল জুড়ে বেবি পিঙ্কের ছড়াছড়ি তার মাঝে সাদা রেখাগুলো জানালার ফাঁক গলে আসা হালকা মিষ্টি রোদে নিজদের পরিষ্কার, স্বচ্ছ আর সুশৃঙ্খল দেখাতে ব্যাস্ত। ঠিক রুমের মাঝখানেই বেড, তার একপাশেই ছোট একটা টেবিল, তার উপরে থাকা ফুলদানিতে রাখা কাচা গোলাপের সুবাসে চারদিক ভরিয়ে তুলচে এক মধুময় আবেশে। অর্গানিক ফুল বরাবরই পছন্দ সানার। তাই তার বেলকনিতে থাকে সবসময় নানা রঙের ফুলের বাহার। দেখে মনে হবে কেউ যেন নিজ হাতে পরম যত্নে সাজিয়েছে। একে বেলকনি কম ফুলের বাগান মনে হচ্ছে বেশি। সানা ধীর পায়ে হেঁটে চলে যায় ওয়াসরুমে। আধাঘণ্টা পর ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে যায়।

‎সিড়ি দিয়ে নেমে প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল কালো দেওয়াল, সানা মাঝে মাঝে বুঝতে পারে না এই লোকের কালো এত পছন্দ কেন? সানার কাছে কালো মানেই অন্ধকার, কিন্তু সে আলোতে অভ্যস্ত। তাইতো নিজের রুম সে নিজের মনমতো সাজিয়েছে। ডয়িং স্পেসে রয়েছে কুচকুচে কালো রঙের সোফা, মার্বেল টেক্সচারের গাঢ় কার্পেটের উপর বসানো গোলাকার ট্রিটেবল। পাশেই ডাইনিং স্পেস, একটা গোলাকার কাচের টেবিল।তার উপরেই ঝুলছে পেন্ডেট লাইট,যার সোনালি আলো এক মুহূর্তে কারো নজর কাড়তে সক্ষম। পাশেই একটা বড় কিচেন। ঠিক কিচেনের বিপরীত পাশে একটা গেস্ট রুম পাশে একটি ছোট রুম যেখানে মিসেস আয়েশা থাকেন। যিনি সকল কাজ দেখাশুনা করেন। বাকি দুজন রাতে চলে গেলেও তিনি এখানেই থাকেন। তার আপনজন বলতে কেউই বেচে নেই। ডয়িং এর একপাশে অবস্থিত সিড়িটি যা কাঠের ও লোহার সমন্বয়ে গঠিত। উপরেই রয়েছে দুটি বেড রুম একটিতে সানা অপরটিতে রানভীর থাকে। পাশেই একটা রুম যেখানে অলওয়েজ তালা ঝুলানো থাকে। সানা নিজেও জানে না এই রুমে কী আছে,কোনদিন ও জানতেও চায়নি। মাঝে মাঝে রানভীর কে দেখে সেই রুম থেকে বেরুতে। রুম তিনটি সিঁড়ির সাথে লাগানো রেলিং দিয়ে ঘেরা। তাদের ফ্ল্যাট টি গুলশানে, পুরো বিল্ডিং এ এই একটিমাত্র ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট,যেটা সাত তালায় রয়েছে। বাকি গুলো স্বাভাবিক ফ্ল্যাটের মতোই।

‎এরমধ্যে দুইবার কলিংবেলের শব্দ এলো।সানার ভাবনার বিচ্ছেদ ঘটল,একমুহূর্তে ভ্রু কুচকে এলো। কারণ সে জানে এখন কে আসতে পারে।তাই কোন কিছু না ভেবে উল্টো ঘুরে নিজের রুমে ফিরে গেল। এই কালনাগিনীর মুখ দেখলে তার দিনটাই খারাপ যাবে।

‎মেঘা গিয়ে ডোর ওপেন করার সাথে সাথে ভেসে ওঠে এক বিরক্ত মাখা মুখ ঈশানী শাহ, রানভীরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ঈশানের বোন, সাথে রানভীরের কো অ্যাকট্র্যাস এবং জেবি কোম্পানির মেইন মডেল। ঈশানী এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে ভিতরে চলে আসে নিজের হাইহিলের টকটক আওয়াজ তুলে। বিরক্তি মাখা কণ্ঠে সে বলে ওঠে,

‎"তোমাদের কে কাজে রেখেছে কে? নিশ্চয় ঐ গেয়ো ডাইনিটা, এই জন্য কাজে এত ফাঁকিবাজ তোমরা। "

‎ মেঘা নিচু স্বরে বলে ওঠে,

‎"সরি ম্যাম আমি....

‎আর কিছু বলার আগেই আবারও ঝাঁঝালো কণ্ঠে শোনা গেল,

‎"তোমার সরি তোমার কাছেই রাখো। তুমি জানো তুমি দরজা খুলতে ঠিক দেড় মিনিট লেট করেছ। আমার মতো একজন ফেমাস প্যারসনের জন্য এটা কতটা অপমান জনক।আর আমি বলছিই বা কাকে। এখন এটা বলো আর জে কোথায়? "

‎মেঘা এতক্ষণ ঈশানীকে মনে মনে হাজার টা গালি দিয়ে ফেলেছে, এই মেয়েকে সে দুই চক্ষে দেখতে পারে না। তারপরেও একেই সকাল সন্ধ্যা দেখতে হয়।মেঘা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

‎"স্যার এখনো জিম থেকে ফিরেনি"

‎ মুহূর্তে ঈশানীর ভ্রু কুচকে এলো,একপলক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে না নয়টা প্রায় বাজতে চলছে। আর জে তো সারে আটটায় চলে আসে। সে কিছু না বলে সোফায় গিয়ে বসে। আর বলে,

‎"মালা কে ডেকে দাও"

‎আচ্ছা বলে মেঘা চলে যায়। মালা মেঘার চাচাতো বোন সাথে ঈশানীর গুপ্তচর।এবাসার সব খবর সে ঈশানীর কাছে প্রচার করে বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকাও বুঝে নেয়।

‎একটু পরেই ক্লিক শব্দ করেই দরজা খুলে গেল আর প্রবেশ করল এক দীর্ঘ সুঠামদেহী বলিষ্ঠ যুবক। কালো রঙের হুডি পরহিত ৬ ফিট ১ ইঞ্চির সেই ব্যক্তি আর কেউ না রানভীর জাওয়ান।দেখেই বুঝা যাচ্ছে কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে এই পেটানো বডি বানানোর জন্য। চোখেমুখে স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্যের ছোয়া আর চোখে ভেসে আসছে তীব্র আত্মবিশ্বাস। বয়স ত্রিশ এর কোঠায় হলেও কারো বুঝার সাধ্য নেই। ঘামে ভেজা সিল্কি চুল গুলো সারা কপাল জুড়ে লেপটানো যা তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। উজ্জ্বল ফর্সা মুখশ্রী আর ডার্ক ব্রাউন আইস তাকে সবার থেকে আলাদা করেছে।দেখেই মনে হচ্ছে কোন হলিউডের নায়ক। তার এই ব্যক্তিত্ব আর সৌন্দর্যের জন্য মাত্র পাঁচ বছরেই খ্যাতির শীর্ষে সাথে টলিউডের সেরা অভিনেতার সকল পুরুষ্কার রয়েছে তার ঝুলিতে।

‎রানভীরের দৃষ্টি সামনে পরতেই ঈশানী নজরে এলো,মুহূর্তে একটা বিরক্তি ভাব ফুটে ওঠে চেহারাতে। নিজেকে যথেষ্ট শান্ত করে শীতল কণ্ঠে শুধালো,

‎"তুমি,,,,,, তুমি এখানে কী করছ?"

‎ঈশানীর ধ্যান ভাঙলো, এতক্ষণ সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। রানভীরের প্রশ্নে সে ভনিতা করে বলতে শুরু করল,

‎"আর জে ইউ নো আমি একা ব্রেকফাস্ট করতে পারি না। তাই তোমার সাথে...

‎সামনে তাকাতেই রানভীরের বিরক্তি ভরা মুখ দেখে ঈশানী ঢোক গিলে বাকি কথা ফেলে ধীরে ধীরে মিনমিনিয়ে বলতে লাগল,

‎"আই মিন তোমার আর সানার সাথে ব্রেকফাস্ট... "

‎রানভীর ওর বাকি কথা থামিয়ে বলে দিল,

‎"সাতসকাল আমি কোন ঝামেলা চাই না"

‎ব্যাস আর কোন কথা না শোনার প্রয়োজন মনে করলো আর না জানার।এমনিতেই রানভীরের মন মেজাজ ভালো নেই এখানে থাকলে আরও কী বলে ফেলবে। কালকে সানার সাথে একটু বেশীই খারাপ বিহেভ করেছিল।একেই সানা উল্টোপাল্টা কথা বলছিল তারউপর রানভীরের ও মাথা গরম ছিল। পরে যখন বুঝতে পেরেছিল থাপ্পড় দেওয়া উচিত হয়নি তখন অবশ্য সানার রুমে গিয়েছিল কিন্তু সানার রুমের দরজা বন্ধ ছিল। ভেবেছে আজ সকালে কথা বলবে কিন্তু এখন পর্যন্ত তার দেখা নাই।সে ও এই সম্পর্কটাকে মানার চেষ্টা করছে, হয়তো একটু সময় লাগবে কিন্তু সানার রোজকার ব্যবহারে সে ভীষণ বিরক্ত।এমন মনে হচ্ছে তার লাইফ টাও তার বাবার মতো হয়ে যাচ্ছে।

‎কিছুক্ষণ পরে আর জে নিচে নামে সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে।তার পরনে কালো সিল্কের শার্ট,বুকের উপরের তিনটি বোতাম খোলা। উঁকি দিচ্ছে তার লোমশহীন বুক।শার্টের উপরেই কালো সুট।সাথে কালো প্যান্ট।গাঢ় কালো লেদারের লোফার, হালকা পলিশে দীপ্তমান বুট গুলো একদম মানানসই। হাতে রোলেক্স ঘড়ি, সবকিছু মিলিয়ে স্বচ্ছন্দতার আভিজাত্য, আধুনিকতার শুদ্ধতা এবং ব্যক্তিত্বের তীক্ষ্ণ দীপ্তিতে গড়া এক নিখুঁত পুরুষালী উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

‎ঈশানী খেয়ে ফেলার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রানভীর কে সে ছোটবেলা থেকেই পছন্দ করে। আর জে কোন দিকে না তাকিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো। ঈশানী ও তার পিছন পিছন যায়। আর জে বসতেই ঈশানী স্বভাবসুলব তার পাশের চেয়ার দখল করে নিল। আর জে দেখে ও অদেখা করে গেল। মিসেস আয়েশা দুজনকেই ব্রেকফাস্ট সার্ভ করতে শুরু করলেন। আর জে মুখে একটা ব্রেড নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‎"সানা কোথায়? "

‎মিসেস আয়েশা হাতের কাজ থামিয়ে বললেন,

‎"সানা এখনো নিচে আসেনি.....

‎ওনার বলার সাথে সাথেই ওনার পাশ দিয়ে কানে ইয়া বড় হেডফোন লাগিয়ে পুল সাউন্ডে 'Gata Only,গান ছেড়ে, গানের তালে তালে গা দুলিয়ে কিচেনে চলে গেল। চারপাশে কে আছে, কি আছে একমুহূর্তের জন্য তাকিয়ে দেখেনি। আরজে আর ঈশানী অবাক নয়নে তাকে দেখতে লাগল। যেই মেয়ে এক মিনিটের জন্যও ঈশানী কে দেখতে পারত না আজ সে না দেখেই চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সানা আবার ফিরে আসল হাতে জুস। কোনো দিকে না তাকিয়ে মিসেস আয়েশাকে বলল্,

‎"আয়েশা খালা আমার ব্রেকফাস্ট রুমে পাঠিয়ে দিবেন "

‎কথা শেষ যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে গেল। পিছনে ফেলে গেল তিন জোড়া বিস্মিত চোখ।

‎(আমি নতুন লেখিকা। ফলো দিয়ে আমার পাশে থাকবেন। ভুল অবশ্যই হতে পারে, ধরিয়ে দিলে আমি খুশি হবো। আর বর্ণনা বেশি হলে বলবেন আমি কমিয়ে দিবো।❤️)

‎ #পর্বসংখ্যা৩

‎ #হ্রদয়ামিলন

‎ #Shavakhan

‎রোজকার মানুষের ব্যবহার টা যখন হঠাৎ থেমে যায় তখন সবারই সন্দেহ হয়, যেমনটা এখন হচ্ছে ঈশানীর। সে মুখের খাবার না চিবিয়ে ভ্রুক্ষেপহীন তাকিয়ে আছে সানার যাওয়ার দিকে। আর মনে মনে ভাবছে,

‎"এইটা কী হলো! যেই মেয়ে আমাকে দেখলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠত সে না তাকিয়েই চলে

‎গেল।"

‎কিছু একটা ভেবে তাড়াতাড়ি দুই গালে হাত বুলিয়ে দেখে ভাবল, "কোথাও আমার মেকআপ কম হয়নি তো, নাকি আমায় চিনতে পারে নি।রোজকার মতো আধা ঘণ্টা লাগিয়ে তো মেকআপ করেছি।আয়নাতে ও দেখলাম ঠিকই আছে।হয়তো আমি সপ্ন দেখছি। "

‎এই ভেবে ঈশানী নিজেই নিজের হাতে চিমটি কাটল পরপরই 'আহ' করে চিৎকার করে ওঠল।সাথে সাথে সবার দৃষ্টি সানার থেকে সরে তার দিকে এলো।ঈশানী একটা ছোটোখাটো হাসি উপহার দিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। আর জেও নিজের কাজে বহাল হলো কিন্তু মনের মাঝে একটা খটকা থেকেই গেল। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ঈশানী সামনে তাকিয়ে দেখল মালা দাড়িয়ে আছে তাকে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করল কিছু হয়েছে কি না, সে মাথা নেড়ে বুঝাল সে কিছুই জানে না।তারপর সে ও কিচেনে চলে গেল।

‎আরজে আর ঈশানীর খাওয়ার পর তারা চলে যায়। আজ তাদের শুট আছে। কিন্তু আর জের এমন মনে হচ্ছে কিছু ফেলে যাচ্ছে। হ্যা, রোজ বের হওয়ার আগে সানা হলরুমে থাকবে। রানভীর কে এটা ওটা বলবে আজ সানা সেখানে নেই।কোথাও তার আঘাতে বেশি কষ্ট পায়নি তো সে ভাবতে ভাবতে লিফ্ট এসে থামে পার্কিংলটে। তার ভাবনার বিচ্ছেদ ঘটে, সে বেড়িয়ে হেটে যায় গাড়ির কছে। পেছন পেছন ঈশানীও আসে।তার নিজের গাড়ি থাকা সত্বেও সে আরজের সাথেই যাবে।

‎পার্কিংলটেই দাড়িয়ে আছে আর জের অতি পছন্দের কালো চকচকে বিএমডব্লিউ i7, যেটা সে বিশেষ ভাবে জার্মান থেকে ইমপোর্ট করেছে। তার আরও তিনটা গাড়ির সাথে কয়েকটি বাহিরের দেশ থেকে আমদানি করা নিউ মডেলের বাইক ও দেখা যাচ্ছে। বাইকের প্রতি তার ভীষণ জোক তাই মায়ের কড়া নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও বাইক চালাবে।

‎তবে এগুলো তার শখের গাড়ি যেগুলো ডাইভ করে সে নিজে কোন পার্টিতে যায়।

‎ সামনে তার ডাইভার কামাল একটা সাদা টয়োটা নিয়ে দাঁড়িয়ে তার আসার অপেক্ষায়। পিছনের সিটে আর জে আর ঈশানী বসার সাথে সাথে কামাল গাড়ি স্টার্ট দেয়। কিন্তু আর জের সেদিকে কোন খেয়াল নেই। গাড়ি গেট পার হওয়ার আগেই সে গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,

‎"স্টপ, কামাল তুমি ঈশানী কে নিয়ে চলে যাও আমি অন্য গাড়ি নিয়ে চলে আসব।"

‎ব্যাস কথা শেষ, সে কোন দিকে না তাকিয়ে বেড়িয়ে চলে গেল। পিছনে ঈশানী বলে ওঠল,

‎"কিন্তু আর জে,,,,,,,,,,,,,,,৷

‎আর বলা হয়ে ওঠল না কারণ আর জে অলরেডি বড় বড় কদম ফেলে দৃষ্টিগোচরে চলে যায়। কামাল ও গাড়ি নিয়ে চলে যায়। ঈশানী আর কীইবা বলবে আর জে কারো কথা শুনলে তো।

‎আর জে আবার ফ্ল্যাটে আসে, ডাইনিং এরিয়ায় দেখে, না মেয়েটা নেই, নিশ্চয় রুমে আছে। কিছু না ভেবে সানার রুমের দিকে চলে গেল। একবার নক করল, না ভেতর থেকে কোন আওয়াজ আসছে না। দরজা খুলা দেখে সে ভিতরে ঢুকে গেল।

‎ঢুকেই এক অদ্ভুত দৃশ্যের মুখোমুখি হলো, সানা বেডের পাশের ছোট টেবিল টার উপর,মোবাইল স্ট্যান্ডের উপর মোবাইল রেখে, খাটের উপর আরাম করে বসে ঘিয়েভাজা পরোটা নিয়ে দুধ চায়ে চুবিয়ে খাচ্ছে। সে খাচ্ছে কম সামনে মোবাইলের স্কিনে চলতে থাকা 'মটু পাটলু' কার্টুনের সাথে তাল মিলিয়ে হাত পা নাড়াচ্ছে বেশি। আর আবোল তাবোল গেয়েই চলছে '

‎"না দেলা না দেমদি না ঘুরি,

‎এ মটু আর পাটলু কি জুরি -২

‎মটু আর পাটলু কি জুড়ি,,,,,,,,২

‎আর জের মনে হলো সে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবথেকে বেসুরো গান শুনচে। এই এক বছরে সে সানার গান কোনদিনও শুনে নি। সে এতবড় সিঙ্গার আর তার বউয়ের গলা এইটা বিশ্বাস করতে একটু কষ্ট হলো। নিজেকে সামলিয়ে সানাকে ডাকল,

‎"সানা"

‎সানা চুপ হয়ে গেল, দৃষ্টি এখনো মোবাইলে। আরজে একটুদম নিয়ে বলতে শুরু করল একদম শান্ত কণ্ঠে,

‎"লিসেন সানা,আমি কাল এমন কিছুই করতে চাইনি। আমি হাজার বার বলেছি আমার আর ঈশানীর মাঝে কোন সম্পর্ক নেই। এগুলো শুধু ফ্যানদের বানানো আর মিডিয়া সেটাকে পাবলিসিটির জন্য ইউস্ করছে জাস্ট নিজেদের পপলারিটি বাড়ানোর জন্য। আর তুমি,,,,,,

‎আর কিছু বলার আগেই শোনা গেল সানার রুম কাঁপানো হাসি। আর জে কিছুটা ভড়কে গেল, সে তো হাসির কিছুই বললো না, এই মেয়ে এইভাবে হাসলো কেন? আবারও আসল সানার আওয়াজ,

‎"ও....এম.....জি...আইম্মা সিংগাম স্যার, আম আ বিগ ফ্যান অফ ইউ ম্যান, সিংগাম কি জাংগুল ছে বাছনা ইয়ামপসিবালা...ইয়ামপসিবালা"

‎সানা সিংগামের মতো দুইহাতে গুলি ধরে পিছনে পিড়তেই দেখল রানভীর তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। সে সামনে তাকিয়ে ভাবছে, "এই লোক এখানে কেন?"। মোবাইল অফ করে সানা কান থেকে ব্লুটুথ খুললো তারপর চোখ মুখ শক্ত করে রানভীর কে শুধালো,

‎ " কিছু চাই? "

‎রানভীর অবাক না হয়ে পারল না, এই মেয়ের সাথে সে এতক্ষণ কথা বলল্ আর সে নাকি কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে কার্টুন শুনছিল। ভীষণ রাগ হচ্ছে রানভীরের, কিন্তু এখন রাগা ঠিক হবে না।তাই নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রেখে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল্,

‎"আমি এতক্ষণ যা বলেছি, তুমি কিছুই শুনতে পাওনি "

‎ভেসে এলো সানার কাঠকাঠ জবাব,

‎"আপনি ব্লুটুথ কানে লাগিয়ে শুনতে পান?"

‎রানভীর কিছু বলবে তার আগেই সানা হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিল,

‎"এক সেকেন্ড "

‎ চিৎকার করে মালাকে ডাকল্,

‎"মালা,,,,,,মালা"

‎মালা তড়িঘড়ি করে দৌড়ে এসে বলল, "জি ম্যাম"

‎"আমি তোমাকে বলেছি বেশি করে ঘি দিতে, তুমি দিয়েছিলে।"

‎"জি ম্যাম"

‎"হয়নি, আবার গিয়ে ভেজে নিয়ে আসবে"

‎মালা আচ্ছা বলে যাওয়ার সময় রানভীরকে দেখে শয়তানি হাসি দিয় আবারও বলে,

‎"ম্যাম ঘি কতটুকু ঢালব?"

‎সাথে সাথে সানা ঝাঁজ নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

‎"গুপ্তচরিতে যতটাকা পাওয়া যায় অত টাকার ঘি ঢালবে "

‎ ব্যাস মালার মুখ পাঠা বেলুনের মতো চুপসে গেল। সে আর কোন দিকে না তাকিয়ে চলে গেল। রানভীর বুঝতে না পারলে ও মালা ঠিকই বুঝতে পেরেছে সানা কী বলছে। আর জে এখনো বিস্মিত চোখে পর্যবেক্ষন করছে, সে আজ পর্যন্ত সানাকে কারো সাথে গলা উঁচিয়ে কথা বলতে দেখেনি।

‎সানা এবার আর জের দিকে তাকিয়ে বলল্,

‎"হ্যা আপনি কী যেন বলছিলেন? "

‎এই বলে সানা নিজের হাতের মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর জে ভীষণ বিরক্ত,একেতো এইসব কথা ওর সাথে যায় না, তারউপর নাকি আবার বলতে হবে। সে রাগ গিলে, দুই আঙুল দিয়ে মাথায় দুইপাশে স্লাইড করে শীতল কণ্ঠে শুধালো,

‎"সানা হয়তো আমার এমন বিহেভ করা ঠিক হয়নি"

‎‌সানার দৃষ্টি স্কিনে রেখে ছোট করে বলল,

‎"হুম"

‎"দেখ আমি স্টেট কথা বলতে পছন্দ করি,এই সম্পর্কটাকে মানতে আমার আরও সময় লাগবে"

‎"হুম"

‎"তুমি এই বিষয়ে কিছু বলতে চাও?"

‎"হুম"

‎"সানা ক্যান ইউ হেয়ার মি"

‎"হুম"

‎আরজে বেজায় বিরক্ত, সানা কখন থেকে মনোযোগ সহকারে মোবাইলে কী যেন দেখছে আর হুম হুম করছে।মনে হচ্ছে তার কথা শুনচেই না। এবার আর জে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারল না।ঝাঁঝালো কণ্ঠে গর্জে উঠলো,

‎"সানা তো,,,,,,,,,,,,,,,,,,

‎আর কিছু বলার আগেই সানা একটু জোরেই বলে ওঠল,

‎"আহ চিৎকার করছেন কেন? কানের পোকা তাড়াবেন নাকি"

‎একপলক আর জের দিকে তাকাল পরক্ষণেই মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল্,

‎"আর হ্যা, আই একসেপ্ট ইউর সরি।আপনার হয়তো শুটের জন্য লেট হচ্ছে না,কিন্তু আমার কাজের জন্য লেট হচ্ছে। এক্সকিউজ মি"

‎সানা মোবাইল টা বিচানায় রেখে, সাইড ডয়ার থেকে একটা কাঁচি নিয়ে আর জের পাশ কাটিয়ে বেলকনিতে চলে যায়। বেলকনিতে থাকা কিছু গোলাপ গাছের হলুদ পাতা কাটতে এতটা ব্যস্ত হয়ে পরে যেন সে আর পাতা ছাড়া আর কেউ নেই।

‎আরজে এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে, সে সানার থেকে এমন জবাব কস্মিনকালেও আশা করেনি।হাতের ঘড়িতে নজর বুলাতেই দেখল প্রায় দশটার কাছাকাছি। নাহ আর দাড়ানো যাবে না। অলরেডি সে লেট বাড়ি এসে সানার সাথে কথা বলা যাবে, সানাতো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। আর জে রুম ত্যাগ করতেই সানা আড়চোখে পিছন ফিরে তাকাল।যখন আর জে প্রথম রুমে এসেছিল তখনই বুঝতে পেরেছিল। আর জের ইউস করা 'মঁসেরা' পারফিউমের তীব্র কফি আর ভ্যানিলার স্মেল তার নাকে এসেছিল।কিন্তু সে রানভীর কি রিয়েক্ট করে দেখতে চেয়েছিল। একটা বাঁকা হাসি দিয়ে সানা নিজেই নিজেকে বাহবা দিল,

‎"বাহ সানা! বাহ, ওয়াট এন এক্টিং। আ'উইল এ্যাপ্রিশিয়েট ইউ"

‎তারপর ধীর পায়ে হেঁটে বেলকনির রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকাল। নিচে আর জের গাড়িটা দেখা যাচ্ছে। সানা শক্ত করে রেলিং টা ধরল চোখ বন্ধ করে ভাবল, এই একবছরে সে এই সম্পর্কটাকে রক্ষার জন্য কী না করেছে। রানভীরের করা তার প্রতি প্রতিটা অবহেলা সহ্য করেছে।রানভীর ওকে এই এক বছরে একপয়সার দাম ও দেয়নি আর না দিয়েছে একমুহূর্ত সময়।কোনদিনও তার খোঁজ খবর রাখেনি। মনে পড়ছে, রানভীরের মায়ের প্রতিটা ধারালো কথা।আর জের মা মিসেস সোফিয়া তাকে উঠতে বসতে মনে করিয়ে দিত সানা ছোট ঘরের। আর জে এসব শুনলেও তার মায়ের উপর কিছুই বলতো না।ভদ্রমহিলা ভীষণ অহংকারী। সানা জানেনা কেন উনি ছোট ঘরের লোকেদের সহ্য করতে পারে না। আর জের পুরো পরিবার প্রতি ক্ষনে ক্ষনে তাকে মনে করিয়ে দিত সানা আরজের যোগ্য না। আর কাল রাতে রানভীর নিজে বলেছে তার সাথে সানাকে মানায় না। এতদিন সে সবটা নিজের মায়ের জন্য মুখ বুজে শুনেছিল, কিন্তু যখন তার মা মারা গেল তখন সে কাউকে কছে পায়নি।সানা খুব করে বুঝেছে এরা কেউই আপন হবে নাহ। সানা ধীরে ধীরে চোখ খোলে, দাঁত খিঁচিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,

‎"প্রত্যকটা মানুষের লাইফে দুটো পার্ট থাকে। একটা দেখা, অন্যটা দেখানো। আমার তো দেখার পার্ট শেষ, এবার আপনাদের দেখানোর পালা সানা খান কি জিনিস।"

‎ভেতর থেকে মোবাইলের টিং টিং আওয়াজ আসল।সানা গিয়ে মোবাইল খুলে দেখল কাঙ্খিত ম্যাসেজটি,

‎"I'm back to BD, Plz pick up me."

‎সানা ছোট করে একটি ভয়েস পাঠালো,

‎"আমি আধা ঘণ্টার ভিতরে এয়ারপোর্টে আসছি"