cheptar;দেবশঙ্কর র শরীর টা ভালো নেই আজ।
' কাল রাতে মটনের ঝোলটা অতটা না খেলেই হতো। আহা উজি র রান্নার হাতটা ঠিক ওর লেখার মতোই মিষ্টি আর পটু। না, আজকে আর পার্কে হাঁটতে যাওয়া যাবে না বিকেলে । অতসী দেবী কে একটা হোয়াটস্যাপে মেসেজ করে জানিয়ে দিতে হবে' নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগলেন দেবশঙ্কর।
দেবশঙ্কর র বয়স ৬৭ পেরিয়েছে। ব্যাঙ্কের চাকরী থেকে অবসর নিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। স্ত্রী দীপ্তি দেবী তিন বছর হলো পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। স্বামীর সাথে রেখে গেছেন তিন ছেলে মেয়েকে। বোম্বে আই আই টি থেকে পাশ করে বড়ছেলে প্রলয় ডেনমার্কে থাকে । বিয়ে করেছে জার্মান মেয়ে এমিলিয়া কে। দীপ্তি দেবীর প্রথমে একটু আপত্তি ছিলো এই বিয়ে নিয়ে। ছোটো থেকেই উজি কে প্রলয় র জন্যে মনে মনে পছন্দ করে রেখেছিলেন দীপ্তি দেবী। কিন্তু দেবশঙ্কর বাবুর হস্তক্ষেপে প্রলয় ব্যাপারটা সামলাতে পেরেছিলো। এমিলিয়া আর প্রলয়ের দুটো যমজ ছেলে । ছেলেদুটোর ডাকনাম জার্মান হলেও , এমিলিয়া আর প্রলয় ছেলেদের ভালো নাম রাখার ক্ষেত্রে দীপ্তি দেবী র কথা এক সেকেন্ডেই মেনে নিয়েছিলো। বাচ্চা দুটোর ডাকনাম এমিল আর পল। আর দীপ্তি দেবী অনেক খুঁজে গুরুদেবের সাথে আলোচোনা করে আদরের নাতিদের নাম দিয়েছিলেন ঐক্য আর প্রবাল। উজিও বেশ যত্ন র সাথে তার দীপ্তি কাকিমা কে প্রলয়দার ছেলেদের নাম খুঁজতে সাহায্য করেছিলো।
উজির পুরো নাম উজ্জয়নী। রবি ঠাকুরের প্রেমে পাগল উজি ইংলিশে এম এ করে একটা প্রাইভেট স্কুলে ইংরেজি পড়ায়। বেশ কয়েকবছর ধরে সরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা বন্ধ। চাকরীর পাশাপাশি একটা এন জি ও র সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছে নিজেকে উজি। এই কাজ টা উজি মনের খিদে মেটাতে করে। আর একটা কাজ উজি মনের অভাব মেটাতে করে। খুব ভালো লেখে উজি। প্রথমে ফেসবুক, ফেসবুকে নিজের পেজে আর কিছু ম্যাগাজিনে লিখতো। এখন লেখার পরিধি বেড়েছে উজির। ইতিমধ্যে দুটো ছোটখাটো বইও বেরিয়েছে। বেশ কয়েকটা বইমেলার বিভিন্ন স্টলে সেই বই বেশ বিক্রিও হয়েছে। সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছিলো পেশায় উকিল সমরেশের সাথে। বিয়েটা টেকেনি। দেড় বছরের মাথায় মিউচুয়াল ডিভোর্স হয়ে যায় উজি আর সমরেশের। বাবা মা র একমাত্র মেয়ে উজির মনে হয় বিয়ে, সংসার এগুলো সকলের জন্যে নয়। জীবনের সবকিছুতে কম্প্রোমাইজ, অ্যা্ডজাস্টমেন্ট করার ক্ষমতা হয়তো সবার থাকে না। শুধু এরেঞ্জড ম্যারেজ কেনো, কত ভালোবাসার বিয়েও তো ঠিকঠাক সংসারের শক্ত ভিত গড়তে পারে না।
লিখে বেশ নাম হওয়ার পর কনফিডেন্স পেয়ে বেশ কয়েকটা উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করেছে উজি। লেখার প্রথম দিকে একটা দুটো নামী কাগজে নিজের কয়েকটা আর্টিকেল জমা করেছিলো, উত্তর পাইনি। যেগুলো সত্যি উজির বেস্ট লেখা গুলোর মধ্যে কয়েক টা ছিলো। প্রলয় দা পড়ে বলেছিলো ' কোয়ালিটি রাইটিং' । কিন্তু সংবাদপত্রের এডিটরের থেকে কোনো উত্তর আসেনি। পরে বুঝেছে জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই পলিটিক্স, স্বজনপোষণ আর 'তেলের মাথায় তেল দেওয়া' ব্যাপারগুলো রমরম করে চলে। উজি তার প্রিয় প্রলয় দার থেকে বছর চারেকের ছোটো। দেবশঙ্কর বাবু আর উজির বাবা কলেজের বন্ধু ছিলো। সেই বন্ধুত্ব পরে নিবিড় পারিবারিক বন্ধুত্বের রূপ নেয়। বছরদেড়েক হলো উজির বাবা মা দুজনেই মাত্র ছমাসের ব্যাবধানে মারা গেছে। উজি সময় পেলেই ভালোমন্দ খাবার বানিয়ে নিয়ে আসে তার প্রিয় দেবশঙ্কর কাকুর জন্যে।
দেবশঙ্কর বাবুর দ্বিতীয় সন্তান পরমা এখন হায়দ্রাবাদে থাকে। পরমার বিয়ে হয় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার অঙ্কিত তিওয়ারির সাথে। অবাঙালি ছেলে অঙ্কিতের র সম্বন্ধ নিয়ে আসে পরমার ফুলমাসি ইরাদেবী। অবাঙালি ছেলে অঙ্কিত কে তার বোন দীপ্তির পছন্দ হবে কিনা , এই নিয়ে প্রথমে বেশ সংশয়ে ছিলেন দীপ্তির ফুলদি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হয়। স্কাইপে এমিলিয়া কে দিনের পর দিন দেখে, কথাবার্তা শুনে , চাকরী র সাথে সুন্দর করে সংসার সামলানো দেখে দীপ্তি দেবী র মনের বরফ যে গলে জল হয়ে যাচ্ছিলো দীপ্তি দেবী নিজেও তা বুঝতে পেরেছিলেন। সবথেকে বড় কথা তার ছেলে প্রলয় সুখে থাকছে তার জার্মান জীবনসঙ্গীকে নিয়ে , এটা বেশ স্বস্তি দিয়েছিলো দীপ্তি দেবীকে । তার সংসার গ্লোবালাইজড হয়ে ভালোই আছে তা দেখে দীপ্তি দেবী তার কলতলার ষ্টীলের বালতি, কাঁসার থালা আর শুক্তো দিয়ে মাখা ভাত কে সঙ্গে করে নিয়েই গ্লোবাল হয়ে উঠেছিলেন চিন্তাভাবনায়।
